বাইসাইকেল – রিপন ঘোষ

ভীষণ মেঘ করেছে। একটু আগেও আকাশ ছিল একদম পরিস্কার। হঠাৎ করে এতো কালো মেঘ কী করে এলো! তাহলে কী অভির মন খারাপ দেখে আকাশেরও মন খারাপ হয়েছে!

প্রকৃতির যাই মনে হোক, অভির মন বলছে ওর কষ্টেই আকাশ কালো হয়ে গেছে। কালো মেঘগুলোকে হঠাৎ-ই ভীষণ আপন মনে হলো অভির। আহ্লাদে স্বরে মেঘকে উদ্দেশ্য করে বললো, ও মেঘ! তুমি আমার বন্ধু হবে?

মেঘ বন্ধুত্ব মেনে নিলো কি নিলোনা তাঁতে অভির কিছু যায় আসেনা। সে মন খারাপের ভেজা কন্ঠে বললো, জানো মেঘ আমার বাবা আমাকে একটুও ভালোবাসেনা। তুমি আচ্ছা করে বাবাকে ভিজিয়ে দেবে কিন্তু।

বাবার ওপর অভির এতো অভিমান কেন?

কয়েকদিন আগে অভি হিমেলের বাইসাইকেলে চড়তে চেয়েছিলো। কিন্তু হিমেল চড়তে তো দেয়ই-নি উলটো অপমান করে বলেছে, তোর বাবাকে বলনা সাইকেল কিনে দেয়ার জন্য। রোজ কেন আমার সাইকেল নিয়ে টানাটানি করিস! তোর জ্বালায় নিজের সাইকেলটাও শান্তিতে চালাতে পারিনা!

হিমেলের কথায় অভির মন ভীষণ খারাপ হয়, ভীষণ কান্না আসে। তার মন খারাপের সকল রাগ গিয়ে পড়ে বাবার ওপর। বেশ কিছুদিন থেকেই সে বাবাকে সাইকেল কিনে দেয়ার জন্য বলছে! বাবা যদি সাইকেলটা কিনে দিতো, তাহলে আজ হিমেল এতো কথা বলার সুযোগ পেতোনা।

বেতের ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে মেঘের সাথে কথা বলতে বলতেই অভি ঘুমিয়ে গেছে।

অভির অনুরোধে হোক বা প্রকৃতির খেয়ালে রুদ্রনীল কাঁকভেজা হয়ে বাড়ি ফিরলেন। রুদ্র একজন প্রাণবন্ত মানুষ। শত সংকটেও তার মুখে হাসি জ্বলজ্বল করে। অভির কোন আবদারে তিনি না করতে পারেন না। অভির আবদারে তিনি এমনভাবে সায় দেবেন, যেন আকাশ থেকে চাঁদ এনে দেয়াও তার কাছে কোন ব্যাপার নয়।

কয়েকদিন থেকে রুদ্রনীল অভির থেকে দূরে থাকছেন। অভি ঘুম থেকে ওঠার আগে বেরিয়ে যান আবার অভি ঘুমিয়ে পড়লে বাড়ি ফিরেন। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে তিনি স্ত্রীকে বলেন, আজ তো আগে আগেই বাড়ি ফিরলাম। বাইরেটা এখনো সেভাবে অন্ধকার হয়নি। অভি এই অবেলায় ঘুমাচ্ছে কেন? ওর পড়া নেই আজ?

অরুন্ধতি ডাইনিং টেবিলের কাঁচ পরিস্কার করতে করতে বললে, আজ সকাল থেকেই ছেলেটা মন খারাপ করে আছে। সাইকেল চালানো নিয়ে হিমেল নাকি ওকে আজেবাজে কথা বলেছে। তাই সারাদিন কিচ্ছু খায়নি। চেয়ার বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো। আমি পরে বিছানায় এনে শুইয়েছি।

রুদ্রনীল শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কর্মব্যস্ত দিন শেষে বাড়ি ফেরার আনন্দ যেন পানসে হয়ে গেছে। অভির জন্য আনা কিটক্যাট পকেট থেকে বের করতে করতেও আর বের করেন না। ছেলের আবদারের কাছে কিটক্যাট তো নিতান্ত এক উপহাস!

নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছে রুদ্রনীলের। চোখটা যেন ঝাপসা হয়ে এলো। কোনরকমে ভেজা কাপড় চেঞ্জ করে বাথরুমে ঢুকলেন। শাওয়ার ছেড়ে জলে শরীর দিতেই তিনি আর কান্না আটকে রাখতে পারলেন না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।

জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। তেলের লিটার দুইশো টাকা, ময়দার কেজি ৯০ টাকা, চালের কেজি ৮০ টাকা! কোন জিনিসটার দাম কম! মাছ, সবজি কোন কিছুর দামই হাতের নাগালে নেই। বাড়িওয়ালাও গত মাসে বলে দিয়েছেন জানুয়ারি থেকে বাড়ি ভাড়া বাড়বে। অথচ বেতন সেই আগের মতোই আছে। দু বছর থেকে প্রমোশনটাও আটকে আছে। প্রমোশন হলেই বা কী! যা সেলারি বাড়বে তাঁতে এই খরচের সাথে পাল্লা দেয়া অসম্ভব!

মাসের কুড়ি তারিখেই পকেট একদম ফাঁকা হয়ে যায়। বাকি কদিন খাওয়া-দাওয়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে যায়। কিন্তু এ কদিন যদি পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়, তাঁকে ডাক্তার দেখানোর মতো টাকাটাও হাতে থাকেনা!

দিন কয়েক আগে দুপুরবেলা একজন আইসক্রিমওয়ালা এসেছিলো। অভি মায়ের কাছে এসে গলা জড়িয়ে বললো, মা দশটা টাকা দাওনা, আইসক্রিম খাবো। মাসের শেষ, অরুন্ধতির হাতে থাকা সংসার খরচের টাকাও ফুরিয়ে গেছে। তিনি অভিকে বললেন, বাবা ঘরে তো টাকা নেই। তোর বাবাকে বলবো আইসক্রীম আনতে।

অভি কোন কথা না বলে মাথা নিচু করে বাইরে চলে গেল। অরুন্ধরি ওর পেছন পেছন গেলেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলেন অভি আইসক্রীমওয়ালাকে বলছে, এই যে আইসক্রীম মামা, আপনি আরেকটু থাকুন। আমার বাবা এক্ষুণি বাড়ি আসবে। বাবা আসলেই টাকা দিয়ে দেবো।

আইসক্রীমওয়ালা এক মুহূর্ত্বের জন্য অভির দিকে তাকালো, তারপর অভির দিকে একটা আইসক্রীম বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এই নাও টাকা লাগবেনা। কিন্তু অভি টাকা না দিয়ে আইসক্রীম নিতে রাজী নয়। সে বারবার বলে, আপনি আরেকটু থাকুন। আমার বাবা এখনই চলে আসবে। আইসক্রীমওয়ালা আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেল আর অভি ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। এই দৃশ্য দেখে অরুন্ধতির যেন বুক ফেটে যেন কান্না আসছিলো।

বাসায় ফিরে অরুন্ধতির কাছে এটা শুনে রুদ্রনীলের চোখ জলে ভরে ওঠেছিলো। ছেলে তার বাবার ওপর কত বিশ্বাস করে, কত নির্ভর করে, কিন্তু তিনি ছেলের জন্য কিছুই করতে পারেন না।

খাবার খেতে বসে রুদ্রনীল অরুন্ধতিকে জিজ্ঞেস করলেন, অভি নিশ্চয় খায়নি?

অরুন্ধতির উত্তরের অপেক্ষা না করেই তিনি বিছানার কাছে গিয়ে অভিকে ডাকলেন। কিন্তু ঘুমে এতোটাই কাতর যে বাবার কথা ওর কানেই যাচ্ছেনা। তাই রুদ্রনীল পাঁজাকোলা করে অভিকে কোলে তুলে নিয়ে খাবার টেবিলে বসলেন। তারপর নিজ হাতে ঘুমন্ত অভির মুখে ভাত তুলে দিলেন। এরকমটা তিনি মাঝে মাঝেই করেন। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে সকালবেলা অভির এসব মনেই থাকেনা।

পরদিন বেশ ভোরে অভির ঘুম ভাঙ্গলো। গত কয়েকদিনের মতো যথারীতি বিছানায় বাবাকে দেখতে পেলোনা। সে দুচোখ ঢলতে ঢলতে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। একটু একটু করে সকালের লাল সূর্য উঠছে। অভির কাছে ব্যাপারটা খুব আশ্চর্য্য লাগে! সারাদিন হলুদ-সোনালী থাকলেও সকালে সূর্য্যের রঙ কেন লাল হয় তা তার বোধগম্য হয়না! বারান্দার পাশের একটি গাছে কি একটা পাখি অবিরাম ডেকে যাচ্ছে। ভীষন ভালো লাগছিলো অভির কাছে। তার মাঝে মাঝে মনে হয়, সে যদি পাখি হতে পারত, তবে উড়ে দূরে কোথাও চলে যেত।

অফিসে রুদ্রনীলকে সবাই লেটুস বলে ক্ষেপায়। কারণ অফিস ঢুকতে সপ্তাহে ৩-৪ দিন তার দেরী হবেই। অথচ সেই রুদ্রনীল কদিন থেকে সবার আগে অফিসে আসছেন। আজ কোন কাজেই তিনি মন দিতে পারছেন না। কোন রকমে সময় কাটিয়ে লাঞ্চের সময় বেরিয়ে পড়লেন। অফিসের কাউকে বললেন না পর্যন্ত।

বাইকে স্টার্ট দিতে গিয়ে দেখলেন স্টার্ট নিচ্ছেনা। দু দিন থেকে ফুয়েল রিজার্ভে ছিল। পেট্রোল পাম্প এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে। তাই অফিসের পার্কিং এ বাইক রেখে হাঁটা ধরলেন।

একদম উদ্দেশ্য ছাড়া হাঁটা। কোন নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। হাঁটতে হাঁটতে সিটি পার্কের ভেতর ঢুকে পড়লেন। একটা বড় গাছের নিচে বসলেন, তারপর হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। চোখ বন্ধ করতেই অভির মুখটা ভেসে উঠলো। কদিন এভাবে পালিয়ে থাকবেন!

বেশ খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলেন। এবার গন্তব্য নির্দিষ্ট।

স্বপন দা’র বাসার গেটে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। স্বপনদা হুন্ডি এবং সুদের ব্যবসা করেন। চড়া সুদ নিলেও মানুষ হিসেবে স্বপনদা ভীষণ অমায়িক। কিন্তু তার কাছ থেকে সুদে টাকা নেয়ার প্রধান শর্ত হলো, স্বর্ণ বন্ধক রাখতে হবে। অরুন্ধতির স্বর্ণ বন্ধক রাখবেন তা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না।

ডান হাতের অনামিকার দিকে তাঁকিয়ে তার মন একই সাথে আনন্দ ও বেদনায় ভরে উঠলো। স্বপনদা’র কাছে নিজের আংটি বন্ধক রেখে হাজারে দুইশত টাকা সুদে সাত হাজার টাকা নিলেন।

বাইরে এসে আনন্দের সাথে মনও খারাপ হলো। মায়ের দেয়া শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকুও হারিয়ে গেলো। তিনি জানেন এই দুর্মূল্যের বাজারে চড়া সুদ পরিশোধ করে আংটি ফেরানো আদৌ সম্ভব হবেনা।

অনেকগুলো দোকান দেখেও তার পছন্দ মতো বাইসাইকেল পাচ্ছিলেন না। অবশেষে  একটি লাল রঙের সুন্দর বাইসাইকেল তার নজর কাড়লো। অভি লাল রঙের এই সাইকেলে চড়ে পুরো উঠোন দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে ভাবতেই তিনি রোমাঞ্চিত হলেন। অভির হাসিমাখা মুখ কল্পনা করতেই তার মনটা ভরে গেল।

দরজায় নক করতেই দরজা খুলে দিলো অভি। অভির চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেলো! সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা! কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে যেন স্থবির হয়ে গেলো।

রুদ্রনীল মিটিমিটি হাসছেন। ততোক্ষণে অভির পিছনে অরুন্ধতিও এসে দাঁড়িয়েছেন। অভি বাবার গালের নাগাল না পেয়ে পেটের মধ্যে ঠাস করে একটা চুমু দিয়ে বললো, আই লাভ ইউ বাবা। তারপর লাফ দিয়ে লাল রঙের সাইকেলটায় চড়ে বসল।

বন্যার জল যেমন নদী ছাপিয়ে তার দূ-কুলে ছড়িয়ে যায়, অভির আনন্দ আর খুশির ঝলকানিও যেন দশ হাজার ওয়াটের উজ্জ্বল বাতির মতো সারা ঘরে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।অভির আনন্দে রুদ্রনীল ও অরুন্ধতিকে ভীষন তৃপ্ত দেখায়। এই আনন্দ আর খুশীর কাছে হাজারে দুইশ টাকা সুদকেও বড্ড কম মনে হয়। দুজনের চোখে আনন্দ অশ্রু খেলা করতে থাকে।

আরও পড়ুন >>

Scroll to Top